
আব্দুল লতিফ, ঘাটাইল ॥
কেউ সম্পদ গড়েন নিজের ভবিষ্যতের জন্য, আবার কেউ গড়েন মানুষের মুখের হাসির জন্য। কেউ সুখ খোঁজেন নিজের অর্জনে, আর কেউ খুঁজে পান অন্যের চোখের জল মুছে দেওয়ার মাঝে। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের ভোলারপাড়া গ্রামের সন্তান কুয়েত প্রবাসী মিজানুর রহমান ঠিক তেমনই এক বিরল মানুষ। যিনি বিশ্বাস করেন, “নেওয়ার হাত নয়, দেওয়ার হাতই সবচেয়ে সম্মানের।” তাঁর কাছে মানবসেবা কোনো শখ নয়, কোনো প্রচারণাও নয়; এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ইবাদত। দুই দশকের প্রবাস জীবনের কষ্টার্জিত উপার্জনের বড় একটি অংশ তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন অসহায় মানুষের কল্যাণে। বিনিময়ে চাননি সম্মান, চাননি প্রচার- চেয়েছেন শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।
কুয়েত প্রবাসী মিজানুর রহমান টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের ভোলারপাড়া গ্রামের আব্দুল্লাহ মাস্টারের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে ওঠেন তাঁর সন্তানহীন নানা মাদারজানী গ্রামের মরহুম আব্দুর রহিমের স্নেহের। নাতির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে ১৯৯৮ সালে নানা তাঁর সমস্ত সম্পত্তি মিজানুর রহমানের নামে লিখে দেন। সেই ছাত্রজীবন থেকেই মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে নাড়া দিত। এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেন তাঁর জীবনের স্বাভাবিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে। বিগত ২০০৩ সালের (২৩ নভেম্বর) জীবিকার সন্ধানে কুয়েতে পাড়ি জমান তিনি। দীর্ঘ ২০ বছর প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে ২০২৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু প্রবাসের অর্থ তাঁর জীবন বদলালেও বদলায়নি তাঁর মন। প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করলেও সেই অর্থের অর্ধেক পরিবারের জন্য পাঠিয়েছেন, আর বাকি অর্ধেক ব্যয় করেছেন মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, দরিদ্র শিক্ষার্থীর লেখাপড়া, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে।
নিজের হালাল উপার্জনে নানা আব্দুর রহিমের স্মৃতি ধরে রাখতে মাদারজানী পশ্চিমপাড়ায় ৯ শতাংশ জমি কিনে নির্মাণ করেছেন দারুস সালাম জামে মসজিদ। শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, মানুষের আনন্দের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করেছেন সাতটি ঐতিহ্যবাহী কোষা নৌকা সোনারতরী এবং ঝিনাই নদীতে চারবার আয়োজন করেছেন জমকালো নৌকা বাইচ। দেশে ফেরার পর গত তিন বছরে তিনি শুরু করেন সমাজ পরিবর্তনের এক নীরব বিপ্লব। নিজের অর্থ ব্যয় করে, কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই, নিজের যাতায়াত ও ফোন বিল নিজে বহন করে ৪১ জোড়া (৮২টি পরিবার) অসহায় যুবক-যুবতীর যৌতুকবিহীন সুন্নাহসম্মত বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি শুধু পাত্র-পাত্রীর পরিচয় করিয়ে দেন না; একজন অভিভাবকের মতো বিয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দায়িত্ব নিজ হাতে সম্পন্ন করেন। অথচ বিনিময়ে কখনো একটি কাপ চা পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। শুধু ঘটক হিসেবেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নিজ খরচে গিয়ে শত শত মানুষের রান্নার কাজও করেছেন বিনা পারিশ্রমিকে। নিজের গাড়ি ভাড়া নিজেই দিয়ে অন্যের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মধ্যেই খুঁজে পান জীবনের পরম আনন্দ। তাই মানুষের মুখে মুখে তিনি আজ পরিচিত ‘মানবিক ঘটক’ এবং ‘মানবিক বাবুর্চি’ নামে। বর্তমানে সারা দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘মানবতার মেলবন্ধন’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ ভিত্তিক মানবিক প্ল্যাটফর্ম। প্রায় ৫০০ সদস্যের এই উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে চলেছেন।
এক অসহায় কন্যার বাবা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, মিজানুর ভাই আমাদের মতো গরিব মানুষের ঘরে ফেরেশতার মতো এসেছেন। নিজের টাকায় এসে আমার মেয়ের যৌতুকবিহীন বিয়ের সব ব্যবস্থা করেছেন। খাওয়া তো দূরের কথা, এক কাপ চাও খাননি। তিনি না থাকলে হয়তো দেনার বোঝায় আমাদের পরিবার ভেঙে যেত। ভোলারপাড়া এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, নিজের অর্থ, নিজের সময় আর নিজের শ্রম বিলিয়ে যারা মানুষের জন্য বেঁচে থাকেন। তারাই প্রকৃত মানবতার ফেরিওয়ালা। কুয়েত প্রবাসী মিজানুর রহমান আমাদের গ্রামের গর্ব, আমাদের অহংকার।
কুয়েত প্রবাসী মিজানুর রহমান বলেন, মানুষের কাছে খাওয়ার মধ্যে তেমন আনন্দ নেই। প্রকৃত আনন্দ মানুষকে খাওয়ানোর মধ্যে। দেওয়ার মাঝেই আমার আত্মতৃপ্তি। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চাই। আল্লাহ যেন আমাকে সবসময় দেওয়ার তৌফিক দেন, কারো কাছে হাত পাতার নয়। আজ যখন সমাজের অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ব্যস্ত। তখন মিজানুর রহমানের মতো মানুষ প্রমাণ করে চলেছেন, মানবতা এখনো বেঁচে আছে। তিনি হয়তো কোনো রাষ্ট্রীয় পদক পাননি। কিন্তু শত শত অসহায় মানুষের দোয়া, ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত কৃতজ্ঞতাই তাঁর সবচেয়ে বড় সম্মান। কারণ, কিছু মানুষ ইতিহাস লেখেন কলম দিয়ে। আর কিছু মানুষ ইতিহাস লেখেন মানুষের হৃদয়ে। সেই বিরল মানুষদের একজন মিজানুর রহমান।






