
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলাতে কোনো প্রকার পানি প্রবাহ না থাকা সত্ত্বেও একটি পরিত্যক্ত ডোবার ওপর প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সেতু নির্মাণ করছে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। পানি প্রবাহহীন এই স্থানে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নতুন করে সেতু নির্মাণকে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার ‘মহাপচয়’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নেতৃবৃন্দ।
এলাকাবাসীর দাবি, কোনো জনস্বার্থ ছাড়াই কেবল কাগজ-কলমের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এখানে সেতু না করে স্থানটি মাটি ভরাট করে সোজা সড়ক নির্মাণ করলে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা কমবে। অন্যদিকে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্ট সওজ বিভাগ ও দরপত্র সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নতুন একটি ৩৮ মিটার দীর্ঘ আরসিসি-পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য প্রথমে ১৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকার দরপত্র আহ্বান করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। পরবর্তীতে দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ শেষে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ‘তুর্ন এন্টাপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প এলাকায় কাজ শুরুর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে জানা যায়, প্রস্তাবিত সেতু এলাকার চারপাশে বর্তমানে ঘনবসতি এবং অসংখ্য পাকা ও আধাপাকা বাড়ি-ঘর গড়ে উঠেছে। ভৌগোলিক বাস্তবতায় এখানে কোনো নদী, খাল বা বিলের অস্তিত্ব নেই। এমনকি অর্ধশত বছর আগেই এই এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে এটি একটি সাধারণ ডোবা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কালিহাতী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি শেখ শফিকুল ইসলাম, বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক, ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম, আজগর আলী, শামীম মন্ডলসহ অনেকেই জানান, এমন একটি মৃত ডোবার ওপর পুরাতন জরাজীর্ণ সেতুটি ভেঙে নতুন করে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি সেতু নির্মাণের এই বিশাল আয়োজন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটিকে স্রেফ সরকারি অর্থের অপচয়ের একটি নতুন প্রকল্প বলে আখ্যায়িত করেছেন স্থানীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নেতৃবৃন্দ।

এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বর্তমানে থাকা সেতুটির কারণে ব্যস্ততম এই আঞ্চলিক মহাসড়কের কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড অংশে একটি বিপজ্জনক মোড়ের (ব্লাইন্ড স্পট) সৃষ্টি হয়েছে। এই ত্রুটিপূর্ণ বাঁকের কারণে প্রতিনিয়ত এখানে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে এবং ঝরছে তাজা প্রাণ। এছাড়া সেতুর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আশেপাশের বাণিজ্যিক এলাকার সার্বিক উন্নয়নও থমকে রয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকরা দাবি করেছেন, সেতুর পরিবর্তে এই স্থানে মাটি ভরাট করে সোজা ও প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হোক। এতে মহাসড়কটি নিরাপদ হবে, দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামবে এবং যানজটমুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়ে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, সরকারের ‘ব্রীজ ম্যানেজমেন্ট উইং’ (বিএমডব্লিউ) এর নিয়মিত পরিদর্শন, সমীক্ষা ও টেকনিক্যাল প্রতিবেদন অনুযায়ীই এই সেতুটি পুণর্নিমাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক মহাসড়কের চেইনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই ডিজাইন অনুমোদন করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে এই আত্মঘাতী ও অপচয়মূলক প্রকল্পটি দ্রুত পুণঃমূল্যায়ন করা হোক। সেই সাথে সেতুর পরিবর্তে সোজা সড়ক নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সভাপতি আবুল মনছুর জানান, রাষ্ট্রের টাকা অপচয়রোধসহ দুঘর্টনারোধে সেতুর স্থানে সোজা করে সড়ক নির্মাণ করা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ জনগনের কাজে আসবে। যেখানে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে দুর্ঘটনা কমার বদলে আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমেরী খান জানান, কোন জলাশয় বন্ধ করার এখতিয়ার তাদের নেই। ব্রীজ ম্যানেজমেন্ট উইং এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্রীজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি হতাহতের সংখ্যা কমবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তিনি আরও জানান, গত (৭ আগস্ট) স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান মতিন নতুন এই সেতু নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন।






