
সিনিয়র রিপোর্টার ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসায় ভোটের উত্তাপ ততই বেড়েছে। প্রার্থীরাও ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে পৌছে ভোট প্রার্থনার কাজে শেষ করেছেন। সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে কে হচ্ছেন সংসদ সদস্য। তবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে এখনো জনগণের মাঝে অজানা আশঙ্কা বিরাজ করছে। এদিকে প্রার্থীরা মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা পর্যন্ত প্রচারণার কাজ শেষ করেছেন।
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে এবার ৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রবিউল আওয়াল লাভলু, দাঁড়িপাল্লা প্রতিক নিয়ে জামায়াত ইসলামীর একে এম ডাঃ আব্দুল হামিদ, লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মামুনুর রহিম, হরিণ প্রতিক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) জুয়েল সরকার, হাতপাখা প্রতিক নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আখিনুর মিয়া, মোরগ প্রতিক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যরিষ্টার আশরাফুল ইসলাম ও বাইসাইকেল প্রতিক নিয়ে জেপির তারেক শামস খান হিমু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জানা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের ব্যরিষ্টার শওকত আলী, ভোটার বিহীন নির্বাচনে ২০১৪ সালে খন্দকার আব্দুল বাতেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আহসানুল ইসলাম টিটু এমপি নির্বাচিত। টিটু কিছুদিন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। বিগত ১৯৯১ সালে বিএনপির খন্দকার আবু তাহের এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তী টানা দুইবার এই আসন থেকে বিজয়ী হন। তিনি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। এর আগে জাতীয় পার্টি থেকে একবার ও বিএনপি থেকে একবার এমপি নির্বাচিত হন নূর মোহাম্মদ খান। তিনি প্রতিমন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেন।
অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর নাগরপুরে বিএনপির রাজনৈতি শুন্যতা দেখা দেয়। এ আসনটি মূলত বিএনপি অধ্যুষিত। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বিএনপির মনোনয়ন পেতে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম স্বপন বিএনপি নেতা রবিউল আওয়াল লাভলু, বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী নূর মোহাম্মদ খান, নাগরপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি শরীফ উদ্দিন আরজুসহ বিএনপির প্রায় একডজন নেতা বিএনপির মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে তারা ব্যপক লবিং করেন। সবাইকে ডিঙ্গিয়ে মনোনয়ন পান এক সময়ের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের তুখোর ছাত্র নেতা রবিউল আওয়াল লাভলু। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বিএনপির মনোনয়ন চেয়ে আসছিলেন।
এসব ঘটনায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হবি, সহসভাপতি ফিরোজ সিদ্দিকীসহ মনোনয়ন বঞ্চিতদের সাথে একটি দূরত্ব তৈরী হয়। উপজেলা বিএনপির কমিটির অনেকেই মুখ ফিরিয়ে থাকেন। প্রার্থী পরিবর্তন করতে তারা কেন্দ্রীয় বিএনপিকে চিঠি দেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে প্রার্থী পরিবর্তন হবে না বলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় এবং দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য আহবান জানানো হয়। সম্প্রতি তাদের মান ভেঙ্গেছে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে লাভলুর পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। ভেতরে ভেতরে নেতাকর্মিদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও বিএনপির নেতাকর্মিরা সবাই লাভলুর পক্ষে কাজ করছেন।
নাগরপুরের ভাড়রা গ্রামর চা বিক্রেতা রহমত বলেন, ভাই দেশে দল দুইটা। বিএনপি ও আমলীগ। আওয়ামী লীগ নাই। আছে ধানের শীষ। এলাকার মানুষ ধানের শীষেই ভোট দিবে। অন্য দলের খাওয়া নাই। তবে ভোটের সময় যে আনন্দ থাকে নৌকারে বাদ দেওয়ায় হেই আনন্দ আর নাই।
নাগরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, বড় দলে মনোনয়নের প্রতিযোগীতা থাকবেই। দলের ভেতর অভ্যন্তরীণ কোন কোন্দল নেই। দলর সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। আমরা অবশ্যই বিজয়ী হবো।
এদিকে দেলদুয়ারে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মি কেউ প্রকাশ্যে ও গোপনে স্বতন্ত্র (হরিণ) প্রতিকের প্রার্থী জুয়েল সরকারের পক্ষে কাজ করছে। দেলদুয়ার উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মারুফ হোসেন, ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক রিয়াজ শিকদার, সদস্য পলাশ তালুকদার, এলাসিন ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মনছুর আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক উজ্জল হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক শাকিল খান প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। ইতিমধ্যে তাদের দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মিদের অভিযোগ, জুয়েল সরকারের বাড়ি দেলদুয়ার উপজেলায়। টাকা দিয়ে বিএনপির অনেককেই সে পকেটে নিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মারুফ হোসেন বলেন, টাকা নয় ভালোবেসেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। সব সময় এমপি হয়েছেন নাগরপুর থেকে। এবার আমরা দেলদুয়ার থেকে এমপি নির্বাচিত করব।
তবে দেলদুয়ার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এস এম ফেরদৌস আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ গত ১৭ বছর মানুষকে ভোট দিতে দেয় নাই। জনগণ এবার ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে। দলের বিচ্ছিন্ন দুই একজন টাকার কাছে বিক্রি হয়েছে। তাতে কোন লাভ হবে না। দলের সকল নেতাকর্মি ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছে। আমাদের বিজয় নিশ্চিত।
এদিকে থেমে নেই জামায়াত ইসলামের প্রার্থী একে এম আব্দুল হামিদ। দলীয় নেতাকর্মি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভোট চেয়েছেন। তিনি পেশায় চিকিৎসক। এ আসনের জনগণের সাথে রয়েছে তার সুসম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে এ আসনের জনগণকে বিভিন্নভাবে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন।
নাগরপুর উপজেলা জামায়াত ইসলামের সেক্রেটারি সহকারি অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, দুই দলকেই মানুষ ভোট দিয়ে দেখেছে। তারা চান্দাবাজী আরা ধান্ধাবাজী ছাড়া জনগণকে কিছুই দিতে পারেনি। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। জনগন এদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমরা জয়ী হলে দেশে ইনসাফ কায়েম হবে।
স্বতন্ত্র (হরিণ) প্রতিকের প্রার্থী জুয়েল সরকার বলেন, স্বাধীনতা পর দেলদুয়ার থেকে কেউ এমপি নির্বাচিত হতে পারেনি। আশা করছি দেলদুয়ারের মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে জয়জুক্ত করবে। আমি জয়ী হতে পারলে, দুই উপজেলায় ডায়াবেটিকস হাসপাতাল, ২০টি খেলার মাঠ, দুটি মিনি স্টেডিয়াম, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড করব।
বিএনপির প্রার্থী রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, সবাইকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন নির্বাচন করছি। ১৭ বছর মানুষ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায় নাই। জনগণ ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। আর নির্বাচিত হলে উপজেলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জনগণের দৌড়গোড়ায় পৌছে দেয়ার চেষ্টা করব। এছাড়াও প্রতিটি পরিবারের শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।






