
ফকির ইলিয়াস ॥
মানুষ মঙ্গল চায়। মানুষ কল্যাণ চায়। চায় প্রকৃতির প্রতি ঋজুতা। মানুষ প্রজন্মে-প্রজন্মে গড়ে যেতে চায় ভালোবাসার সেতু। বাংলাদেশে বৈশাখবরণ তেমনি একটি সর্বজনীন উৎসব। যে উৎসবটি সকল ধর্ম, বর্ণ, জাতি, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী মানুষকে নিয়ে আসে একই কাতারে। সবাই দাঁড়ায় অসুরের বিরুদ্ধে। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ স্বাগত।
কবিগুরু বলেছেন- ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/ তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/ রসের আবেশ রাশি শুষ্ক করি দাও আসি,/ আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ/ মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক।’
বাঙালির বৈশাখী আয়োজনের শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর নতুন মাত্রা এসেছে এই উৎসবের। দেশে-বিদেশে প্রজন্ম মেতে উঠছে নাচে গানে, কবিতায়, সুরে, উচ্ছাসে, ভোজে-বিলাসে। বিগত ২০১৬ সালের (৩০ নভেম্বর) এই শোভাযাত্রা পায় ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক এই সংস্থা ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় আন্তঃদেশীয় কমিটির একাদশ বৈঠকে ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব ইন্ট্যানজিয়েবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউমিনিটি’র তালিকায় বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই সভায় বাংলাদেশ ছাড়াও ইউক্রেন, কম্বোডিয়া, কিউবা, স্পেন, আফগানিস্তান, বেলজিয়াম ও উগান্ডার একটি করে মোট ১০টি উৎসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর আগে বিগত ২০১৩ সালে জামদানি শাড়ি ও ২০০৮ সালে বাউল সংগীত ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাঙালি জাতিসত্তার এই অগ্রযাত্রা প্রজন্মকে শানিত করছে।
হ্যাঁ- আমরা একটি অগ্নিস্নান চাই। চাই শুচি হোক ধরা। বৈশাখ বাঙালির উৎসব। শোভাযাত্রা বাঙালির উৎসব। সেই উৎসবকে বন্ধ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বর্ষবরণের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শোভাযাত্রা আয়োজনের বিরোধিতা করেছে কেউ কেউ। এই শোভাযাত্রার দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখি, তা প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালের পয়লা বৈশাখে যশোরে। তখন ছিল দেশে সামরিক স্বৈরশাসন। উদ্দেশ্য ছিল দেশের লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে সব মানুষকে এক করা। এক যাত্রায় নিয়ে আসা। আর সেই শোভাযাত্রায় অশুভের বিনাশ কামনা করে শুভ শক্তির আগমনের প্রার্থনা করা।
এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন চারুশিল্পী মাহবুব জামাল শামিম। তিনি ঢাকার চারুকলা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে যশোরেই ‘চারুপিঠ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন তখন। তিনি মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন, পহেলা বৈশাখে এই শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য ছিল দুটি। দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরা। আর তার মাধ্যমে সবাইকে সত্য এবং সুন্দরের পথে আহ্বান করা। তাই তাদের শোভাযাত্রায় স্থান পায় নানা ধরনের চিত্র, হাতে বানানো পাখা, ঘোড়া, হাতি, ঢোল, বাঁশি প্রভৃতি। শোভাযাত্রাটি থাকে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। এই শোভাযাত্রার মূলভাব প্রতিবাদের, ভালোবাসার এবং দ্রোহের। সেখানে অশুভের বিনাশ কামনা করা হয়। প্রার্থনা করা হয় সত্য এবং সুন্দরের জন্য। আনন্দের কথা হচ্ছে, এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এই শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়েছে। পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষে শোভাযাত্রা একটি প্রধান অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
ইউনেস্কো তার ওয়েবসাইটে শোভাযাত্রার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এই শোভাযাত্রা বের হয়। বিগত ১৯৮৯ সালে সামরিক স্বৈরশাসনের হতাশার দিনগুলোতে তরুণেরা এটা শুরু করেছিল। শিক্ষার্থীরা অমঙ্গলকে দূর করার জন্য বাঙালির নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, প্রাণীর প্রতিকৃতি ও মুখোশ নিয়ে শোভাযাত্রা করে। শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আরো যে কয়েকটি কারণ ইউনেস্কো উল্লেখ করেছে তা হচ্ছে। এই শোভাযাত্রা অশুভকে দূর করা, সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক। এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাঙালির ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতিগত সব ধরনের বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হয়।
বাঙালি জাতি ১৯৭১ সাল থেকেই তাদের নবউদ্যমে যাত্রা শুরু করেছে। বিজয়ী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বিশ্বে। আর এখন বাঙালী জাতির সাংস্কৃতিক কৃষ্টি ও সভ্যতাকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই এই অগ্রযাত্রা অব্যহত রাখা সম্ভব। আমরা দেখি প্রতিবছরই শোভাযাত্রাকে ঘিরে তৈরি হয় বৃহৎ আকারের নানা মুখোশ। বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি হচ্ছে পাখি। তৈরি হচ্ছে বিশাল আকৃতির নানা শিল্প-কাঠামো। তার জন্য আনা হচ্ছে বাঁশ, বেত ও অন্যান্য সরঞ্জাম। অন্ধকারের বিরুদ্ধে এই যে নানা মোটিভ, তা হচ্ছে শৈল্পিক প্রতিবাদ। শোভাযাত্রায় অন্যান্য অনুষঙ্গের সঙ্গে থাকে সূর্যের মুখের কাঠামো। অন্ধকার তাড়াতে যেন আলোয় ভরে ওঠে পৃথিবী।
বাঙালির ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা। একাত্তরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সবাই দেশমাতৃকার মুক্তিপণে অগ্রবর্তী বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের অনেকেই এখনো আছেন এই বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বটবৃক্ষ হয়ে। বেদনার কথা হচ্ছে, বর্ষবরণের উৎসবে এ চেতনাকে নস্যাৎ করার জন্য স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। আঘাত করা হয়েছে বারবার। প্রজন্ম প্রত্যাশা করে, পহেলা বৈশাখে বাঙালি সংস্কৃতির এ চর্চা আমাদের জাতিসত্তাকে আরো বিকশিত করবে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি জোগাবে। রাজনীতির নামে সন্ত্রাস, আগুনে পুড়িয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা ও দেশের সম্পদ ধ্বংসকারী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের আরো ঐক্যবদ্ধ করবে।’ হ্যাঁ- সেই ঐক্যের পথেই এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। দেশের মানুষ শান্তি চায়। তাই কতিপয় ধর্মীয় উন্মাদের হাতে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জিম্মি থাকতে পারে না।
বৈশাখী মেলায় বাংলার সংস্কৃতি ও লোকশিল্পকে ছড়িয়ে দিতে অবদান রেখে চলেছে এই সর্বজনীন উৎসবটি। বৈশাখ তার আপন ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দেয় স্ব-মহিমায় প্রতিটা বাঙালির অন্তরে। বৈশাখের আঁকিবুকিতে বাঙালি নারী আর শিশুদের নানা রঙের পোশাকের সাঁজ ও ছেলে-বুড়োদের বৈশাখী পোশাকে চেতনাকে জাগিয়ে দেয় অন্যরকম আনন্দে। বৈশাখী মেলা মানেই বাঙালির সর্বজনীন মিলনমেলা। আমরা শৈশবে দেখেছি, শুভ হালখাতা মহরতের মাধ্যমে মিষ্টিমুখ করেই এই দিনটি শুরু হতো গ্রামে গ্রামান্তরে ব্যবসায়ী মহলে। আজ তা ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। মানুষের সম্প্রীতির সেতু হিসেবে দিনটি প্রজন্মের মননে থিতু হলেই স্বার্থক হবে সকল আয়োজন।
ফকির ইলিয়াস: কলাম লেখক, কবি ও সাংবাদিক।






