
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলে ট্রাক স্ট্যান্ড না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ট্রাক পরিবহনের মালিক শ্রমিক ও এর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা। ট্রাকের মালিক ও শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যান্ড নির্মাণের জন্য প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে দাবি করে এলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা ও প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে টাঙ্গাইলে নির্মিত হয়নি ট্রাক স্ট্যান্ড। ফলে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করায় শহরে যানজট বাড়ছে। আবার গাড়ি অবৈধভাবে পার্কিংয়ের কারণে পুলিশি হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে এসব চালককে। এছাড়া নিরাপত্তার অভাবে চালকরা থাকেন ঝুঁকির মুখে।
টাঙ্গাইল ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলে ড্রামট্রাক, মিনিট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ছোট-বড় মালবাহী মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার ট্রাক রয়েছে। এসব ট্রাক রাখার নির্ধারিত কোনো স্থান নেই। স্টেডিয়াম এলাকা, পরিত্যাক্ত ভাসানী হল চত্বর, পুরনো বাসস্ট্যান্ডের সামনে, গোডাউন ব্রিজ, শহর বাইপাস রাবনায়, নগড়জলফই, ছয়আনি পুকুরপাড়, বেবিস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন রাস্তার ওপরে মালবোঝাই ট্রাক রাখা হয়।
রাস্তার উপরে পণ্যবোঝাই ও খালাস করতে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক যানজটের। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ জনগনকে। এছাড়াও ঠিকানাবিহীন হয়ে পড়েছে টাঙ্গাইলের ট্রাক মালিক ও শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে তারা ট্রাক স্ট্যান্ডের দাবি করে এলেও তাদের সদিচ্ছার অভাবে তা হচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতাদের অবহেলাও সমান দায়ি। টাঙ্গাইলের সাবেক জেলা প্রশাসক কাওছার জহুরা ট্রাক ও বাস টার্মিনালের জন্য শহর বাইপাস রাবনায় ১৭ একর জায়গা গণপূর্তের কাছ থেকে ১ নম্বর খাস খতিয়ানে এনেছিলেন। তিনি বদলি হয়ে যাওয়ায় প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে সাবেক জেলা প্রশাসক নুরুল আমীন মিঞা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দিতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রতিবেদন সম্ভবত আলোর মুখ দেখেনি। বাস টার্মিনালের জন্য দরপত্র আহবান করে মাটি ভরাট করা শুরু হলেও ট্রাক স্টান্ডের জন্য জমি বরাদ্ধ অধরাই রয়ে গেছে।
ট্রাকচালক মির্জা মজনু বলেন, টার্মিনাল না থাকাতে রাস্তাঘাটে গাড়ি রাখতে হয়। আমাদের বিশ্রামের কোনো জায়গা নেই। পয়ঃনিস্কাশন, গোসল ও নামাজের কোনো স্থান নেই। রাস্তায় গাড়ি রাখলে পুলিশ এসেই মামলা দেয়। নানাভাবে হয়রানি করে। নিরাপত্তার অভাবে শহরের বাইরে গাড়ি রাখা যায় না। অনেক সময় ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে হয়।
ট্রাক মালিক হোসেন আলী বলেন, টার্মিনাল না থাকায় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সামনে গাড়ি রাখতে হয়। জেলা ক্রীড়া সংস্থায় কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে এখান থেকে সরিয়ে ঈদগাহ ময়দানে সরিয়ে দেয়। ঈদগাহ ময়দান থেকে আবার স্টেডিয়ামের কাছে নিয়ে আসা হয়। এখানে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পরিত্যাক্ত ভাসানী হল চত্বরে কিছু ট্রাক রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের মৌখিক অনুমতি নিয়ে এখানে গাড়ি রাখা হয়েছে। স্ট্যান্ড না থাকায় বাধ্য হয়েই মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন নেতাকে বখরা দিয়ে গাড়ি রাখতে হচ্ছে।

টাঙ্গাইল স্টেডিয়াম সংলগ্ন ট্রাক স্ট্যান্ডের শৃংখলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনালের দাবি করে আসছি। টার্মিনাল না থাকায় আমাদের শ্রমিকরা খুবই অসুবিধার মধ্যে রয়েছেন। মাঝে-মধ্যেই গাড়ি চুরি অথবা ছিনতাই হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে গাড়ি পার্ক করায় প্রতিদিন প্রায় শতাধিক গাড়িতে মামলা দিচ্ছে পুলিশ। হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে শ্রমিকদের।
টাঙ্গাইল জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বালা মিয়া বলেন, টার্মিনালের দাবি নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছি। জেলার আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায়ও ট্রাক টার্মিনাল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আজও ট্রাক টার্মিনাল বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শহরবাসী ও ট্রাক শ্রমিক সবাইকেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা ও প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে টাঙ্গাইলে নির্মিত হচ্ছে না ট্রাক স্ট্যান্ড।
টাঙ্গাইল জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফ পাহেলী বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভায় ট্রাক স্ট্যান্ড নিয়ে বারবার আবেদন জানিয়েছি। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকেও আশ^াস দেওয়া হয়েছে। শহর বাইপাস রাবনায় বাস টার্মিনালের সাথে ট্রাক স্ট্যান্ডও করা হবে।

টাঙ্গাইলের ট্রাফিক পরিদর্শক আনিছুর রহমান বলেন, টাঙ্গাইল জেলায় ট্রাক স্ট্যান্ড না থাকায় অবৈধ পাকিং করাটা ট্রাক চালকগণ স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে নিয়েছে। জেলা ট্রাফিক বিভাগ এই বিষয়ে সদা তৎপর এবং আইনি পদক্ষেপ নিতে বদ্ব পরিকর। দীর্ঘদিন হচ্ছে এই বিষয়টি নিয়ে প্রতিটি জেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিং এ আলোচনা হচ্ছে। মৎস এবং প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ট্রাক স্ট্যান্ডের বিষয়ে অবগত আছেন এবং অচিরেই ভালো একটা সুফল শহরবাসী পাবে বলে আমরা আশা করছি।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সফিকুল ইসলাম জানান, টাঙ্গাইল একটি বড় শহর। এখানে পৃথক একটি ট্রাক স্ট্যান্ডের প্রয়োজন। শহর বাইপাস রাবনায় যেখানে বাস টার্মিনালের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সেখানে ট্রাক স্ট্যান্ড করার আপাতত কোন পরিকল্পনা নেই। তবে পাশেই কোথাও ট্রাক স্ট্যান্ড করা যায় কিনা বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে।






