
স্টাফ রিপোর্টার ॥
তরিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন রোববার (২৪ মে) দুপুরে। সঙ্গে ছিলেন শ্যালক নজরুল ইসলাম ও শ্যালকের ছেলে তুহিন। ঈদ উপলক্ষে কম ভাড়ায় বাড়ি যাওয়ার জন্য তারা ট্রাকের আরোহী হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের বাড়ি ফেরা হয়নি। সোমবার (২৫ মে) ভোরে ট্রাকটি যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের সরাতৈল নামক স্থানে ট্রাকটি উল্টে যায়। তরিকুল অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। ঘটনাস্থলেই নিহত হন নজরুল ইসলাম। আহত হন তুহিন।
সোমবার (২৫ মে) সকাল ১০টার দিকে যমুনা সেতু পূর্ব থানায় কথা হয় তরিকুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, বাড়ির লোকজন আশায় বইসা আছে, আমরা দুপুরের মধ্যেই পৌছাইয়া যামু। কিন্তু নজরুল রইছে মর্গে, তুহিন হাসপাতালে, আর আমি থানায় আছি। নজরুলের লাশ কহন বুইঝা পামু।
তরিকুল ও তার সহযাত্রীরা সবাই চট্টগ্রামে ‘হরেক মালের’ (হাড়ি পাতিল, তৈজসপত্র) ব্যবসা করেন। চট্টগ্রাম থেকে জনপ্রতি পাঁচশ’ টাকা ভাড়ায় রাজশাহী পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ট্রাকে উঠেছিলেন। তাদের বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায়। চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে রোববার (২৪ মে) দুপুর ১টায় তারা চারজন ট্রাকে উঠেন। ট্রাকটি সন্ধ্যায় ফেনী পৌছলে সেখান থেকে আরও ১৮ জন আরোহী নেয়। ট্রাকের উপর অন্তত ২৩ জন আরোহী নিয়ে রাত ১টার দিকে ট্রাকটি ঢাকা শহর পাড় হন।
টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যাত্রী খোরশেদ আলম (২৬) জানান, ঢাকা শহর পাড় হওয়ার পর কোথাও যানজটে পড়তে হয়নি। সবাই ট্রাকে বহন করা রডের উপর ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উল্টে যায়। কিছুক্ষণ পর খোরশেদ আলম জ্ঞান ফিরে দেখে তিনি ট্রাকের কাছেই পড়ে আছেন। এ সময় অনেকে রডের নিচে চাপা পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। আস্তে আস্তে তাদের চিৎকার থেকে আসে। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল এসে তাদের উদ্ধার করে।

যমুনা সেতুর পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানী জানান, ট্রাকটির যাত্রীরা ছিল ক্ষুদে ব্যবসায়ী এবং শ্রমজীবী। কম ভাড়ায় গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তারা রডবাহী ট্রাকে উঠেছিলেন।
যমুনা সেতুর পূর্ব থানা পুলিশ জানায়, নিহত ১৫ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন- ১। সাগর মিয়া (২০) পিতা-সাকিম মিয়া, ২। রবিউল ইসলাম (২৫) পিতা-শহিদুল ইসলাম, উভয় সাং-রাজেন্দ্রবাটি, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ ৩। ইসমাইল হোসেন (১৯) পিতা-আলতাফ হোসেন, সাং-বাতানপুর, থানা-তানুর, জেলা-রাজশাহী, ৪। নজরুল (৬০), থানা-শিবগঞ্জ, জেলা -চাপাইনবাবগঞ্জ, ৫। মামুন (৪৫), থানা-সদর, জেলা- চাপাইনবাবগঞ্জ, ৬। সারিকুল (২৫) পিতা- সাইদুল, সাং-মালঞ্চী, থানা-নেয়ামতপুর, জেলা-নওগাঁ, ৭। বারিক (২১) পিতা-আব্দুর রশিদ, সাং-রাজেন্দ্রবাটি, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ ৮। বাদশা (৩২) পিতা-রহিম, সাং-রাজেন্দ্রবাটি, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ, ৯। গিয়াস (২০) পিতা-রশিদ, সাং-পাকুরিয়া, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ, ১০। মাইনুল (২৮) পিতা-রশিদ, সাং-পাকুরিয়া, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ, ১১। ইয়াকুব (২০) পিতা- একাব্বর আলী, সাং-রাজেন্দ্রবাটি, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ ১২। তারেক (২০) পিতা-সুলতান, সাং-রাজেন্দ্রবাটি, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ৮ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন- নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার বাবু (৩৫), হোসেনপুর গ্রামের আব্দুর রহমান (৩৫), দশপাড়া গ্রামের তুহিন (২৫), পাকুড়িয়া গ্রামের আলমগীর (৪০), সিদ্দিক আলী (৪০), রাজেন্দ্রবাড়ি গ্রামের খোরশেদ (২৬), ডেমরা গ্রামের সোমেজ (২৮) ও নাটোরের নয়ন বিশ^াস (৩২)।
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোপালপুর সার্কেল) ফৌজিয়া হাবিব জানান, রডবাহী ট্রাকটির রডের উপর ত্রিপল ছিল। তার উপর যাত্রী বহন করা হচ্ছিল। ট্রাকটির দুর্ঘটনায় ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ শনাক্ত করার জন্য পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।





