
স্টাফ রিপোর্টার ॥
চারদিকে পাখির কিচিরমিচির। এমন সকালে শাখা মুগরা (বানর) মনের আনন্দে গাছের মগড়ালে আড়াআড়িভাবে ঝোলানো রোপওয়ে (রজ্জুপথ) বেয়ে ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে জঙ্গলের এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে। এটি বন্যপ্রাণীর নিরাপদ পারাপার ছাড়াও বনের মধ্যে বাড়তি সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে।
টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মধুপুর বনাঞ্চল অংশে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পাঁচটি বিশেষ রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। পঁচিশ মাইল এলাকা থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত নির্মিত এসব করিডোরের মাধ্যমে সড়ক পারাপারের সময় যানবাহনের ধাক্কায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মধুপুর বনাঞ্চল টাঙ্গাইলের মধুপুর এবং ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছার প্রায় ৬২ হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এর সিংহ ভাগ ছিল মধুপুর উপজেলায়। নানা কারণে বনের বড় অংশ এখন উজাড়। জবরদখলী ভূমিতে কলা-আনারসের রাজত্ব। তবু মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জ এবং দোখলা ও মধুপুর রেঞ্জে এখনো বহুস্তর বিশিষ্ট কিছু প্রাকৃতিক বন রয়েছে। এ বনেই কিছু হরিন, বাগডাস, মেছোবিড়াল, বানর-হনুমান, বনমুরগি ও গন্ধগোকুলসহ ছোটখাটো বন্যপ্রাণী এবং শত প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। বিগত সাড়ে তিন দশক জুড়ে গজারি বন সাবাড় করে সংরক্ষিত বনভূমিতে বিদেশি বৃক্ষে সামাজিক বা অংশীদারত্বের বনায়ন শালসহ হাজারো দেশীয় গাছপালা, গুল্মলতাদি বিলীন করে। ফলে খাদ্যাভাব এবং আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় সব ধরনের বন্যপ্রাণী ও পাখি অস্তিত্বসংকটে পড়ে। খাদ্যাভাবে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে গিয়ে প্রাণ হারাতে থাকে।
টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কে মধুপুর উপজেলার পঁচিশমাইল থেকে মুক্তাগাছা উপজেলার রসুলপুর পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে এখনো বেশ কিছু ঘন বন রয়েছে। বনের পেট চিরে যাওয়া। সড়কটি বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলকে দুভাগে বিভক্ত করেছে। ব্যস্ততম সড়ক পাড়ি দিয়ে এপার ওপার হতেই যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় তারা। এছাড়াও ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ মহাসড়কের কোল ঘেঁষে হাইভোল্টেজ লাইন নির্মাণ করায় বানর-হনুমানসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী প্রায়ই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।
টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্র জানায়, জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন মহাসড়কের দুই পাশে পাঁচটি স্থানে সুউচ্চ গাছের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে দড়ি সংযুক্ত করে এসব রোপওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালি, সিভেটসহ বিভিন্ন বৃক্ষবাসী প্রাণী মাটিতে না নেমেই এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। মধুপুর বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে মহাসড়ক নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হয়েছে। খাদ্য সংগ্রহ কিংবা আবাসস্থল পরিবর্তনের সময় অনেক প্রাণী সড়ক পার হতে গিয়ে দ্রুতগতির যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। নতুন এই রোপওয়ে করিডোর চালুর ফলে সেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে বনাঞ্চলের আরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে একই ধরনের করিডোর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. হাবিবুন নাহার জানান, মধুপুর বনাঞ্চলের দুর্লভ প্রাণী মুখপোড়া হনুমান। এরা উঁচু গাছ পছন্দ করে। খাবারের সন্ধানে গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেড়ায়। গাছপালার আড়ালে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনে এরা হতাহত হয়। এতে জীবন সংশয় ছাড়াও প্রজনন ব্যাহত হয়। বানর-হনুমানের অবাধ চলাচল, খাদ্য সংগ্রহ এবং প্রজনন ঠিক রাখতে বনাঞ্চল থেকে বিদ্যুৎলাইন অপসারণ অথবা নিরাপদ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
মধুপুর জঙ্গলের টেলকি এলাকার ট্রাক শ্রমিক সমিতির সভাপতি লাল মিয়া জানান, খাবারের সন্ধানে বানর-হনুমান দলবেঁধে জঙ্গলের এ সড়কে ঘোরাফেরা করে। পর্যটক বা পথচারীরা গাড়ি খামিয়ে এদেরকে কলা বিছুট বা অন্যান্য খাবার দিয়ে থাকে। খাবারের আশায় প্রতি দিন শত শত বন্যপ্রাণী ব্যস্ততম সড়কে নেমে আসে। যানবাহনে চাপা পড়ে মারা যায়। রোপওয়ে দিয়ে পারাপারে অভ্যস্ত হলে বন্যপ্রাণীর প্রাণহানি কমবে।
টাঙ্গাইল মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. এ এস এম সাইফুল্লাহ বলেন, বনাঞ্চল সংলগ্ন মহাসড়কে এ ধরনের বন্যপ্রাণীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমবে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য রোপওয়ে করিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখান থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মোশাররফ হোসেন বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন বনপ্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বানর, হনুমান, সিভেটসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং যানবাহনের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি কমবে। প্রকল্পটি বিগত ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে আগামী ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। বন কর্মকর্তারা আরও জানান, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস, গাছে বিচরণকারী বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল ও বংশ বৃদ্ধি, আবাসস্থলের বিভাজনরোধ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তায় রোপওয়ে ভালো ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মহসীন জানান, বনের এ অংশ দিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় প্রায়ই বানর-হনুমান এবং নিশাচর প্রাণী যেমন মেছোবিড়াল ও গন্ধগোকুল প্রাণ হারায়। এটি যেন মৃত্যুপুরী। ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেওয়া হলেও চালকরা তা মানেন না। লাউয়াছড়া বনে নির্মিত রোপওয়ে করিডোর লজ্জাবতী বানরকে ট্রেনচাপা থেকে রক্ষা করেছে। এ সফলতা বিবেচনায় নিয়ে মধুপুর বনাঞ্চলে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।





