
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের ইতিহাসে বর্তমানে সবোর্চ্চ ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে জনগন। বিদ্যুৎ গ্রাহকরা বলছেন, গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে টাঙ্গাইল জেলায় বর্তমানে সবোর্চ্চ লোডশেডিং হচ্ছে। এতো ঘন ঘন লোডশেডিং ইতিপূর্বে কখনও দেখা যায়নি। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। ঠিক তেমনি ব্যবসা-বানিজ্যে বিদুৎতের ঘাটতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।
এদিকে পাশাপাশি অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো গ্রাহক। মাসে মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও কারও বিল দ্বিগুণ, আবার কারও তিন-চার গুণ পর্যন্ত বাড়ছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, মিটার রিডাররা অনেক সময় মিটার না দেখেই মনগড়া বিল তৈরি করছেন। এমনকি ঘুস না দেওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। গ্রাহকদের ভাষায়, স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ইউনিট দেখিয়ে তৈরি করা এসব বিলই ‘ভূতুড়ে বিল’। এ নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে বারবার অভিযোগ করেও কাঙ্খিত সমাধান মিলছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
টাঙ্গাইল জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট ও তীব্র লোডশেডিং। জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৭০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ২২৩ মেগাওয়াট। এই বিশাল ঘাটতির কারণে দিন-রাত জুড়ে দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৭০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১০ মেগাওয়াট।
অপরদিকে, গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ১১৩ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি সরবরাহ পাওয়ায় জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ বা ২ ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা। বাসাবাড়িতে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে না পারায় গরমে দিনভর চরম অস্বস্তিতে থাকতে হচ্ছে সব বয়সী মানুষকে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ঘুমাতে পারছেন না। যার প্রভাব পড়ছে তাদের কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি সরবরাহ, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে। জেলায় বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে মিল-ইন্ডাস্ট্রিজ ও বড় বড় কলকারখানাগুলোতে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালু রাখতে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেল চালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে জ্বালানি খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি জেনারেটর খরচ বহন করতে না পেরে সরাসরি লোকসানের মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটে ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানের ব্যবসা-বাণিজ্যও।
টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পেও লোডশেডিংয়ের কালো ছায়া পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের বড় অংশজুড়ে তাঁত চালানো বন্ধ রাখতে হচ্ছে শ্রমিকদের। এতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, কর্মহীন হয়ে পড়ছেন সাধারণ তাঁতশ্রমিকরা। একই অবস্থা জেলার পোলট্রি খামারগুলোতেও। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো যাচ্ছে না। তীব্র গরমে দম আটকে প্রতিদিন খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে গিয়ে ক্ষুদ্র খামারিরা বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এটিএম লুঙ্গি ফেব্রিক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীলিপ কুমার জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ আর উৎপাদন বন্ধ মানে লোকসান। দিনে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। দ্রুত নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের ফৈলারঘোনা গ্রামের আবু হানিফের বাড়িতে তিনটি লাইট, তিনটি ফ্যান ও একটি ফ্রিজ রয়েছে। তার দাবি, বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকলেও বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের কাগজের কোনো মিল নেই। প্রায় ৫শ’ ইউনিট অতিরিক্ত দেখিয়ে বিল করা হয়েছে। আবু হানিফ বলেন, আগে সাড়ে ৩শ’ থেকে সর্বোচ্চ ৫শ’ টাকা বিল আসত। এখন প্রায় দুই হাজার টাকা করে বিল আসছে। মিটার রিডাররা মিটার না দেখেই বিল করেন। বিদ্যুৎ অফিসে বারবার জানিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। টাঙ্গাইল শহরের বেড়াডোমা এলাকার বাসিন্দা একেএম নজরুল ইসলামেরও একই অভিযোগ। তার মিটারে ২ হাজার ৮৫৮ ইউনিট দেখালেও এরই মধ্যে তিনি ৪ হাজার ১৫০ ইউনিটের বিল পরিশোধ করেছেন। ১ হাজার ২৯২ ইউনিটের বিল পরিশোধের পরও গত মাসে ২ হাজার ২০২ টাকার আরেকটি বিল পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, মিটার রিডাররা কৌশলে ঘুস দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরের মাস থেকেই অতিরিক্ত বিল আসতে শুরু করে।
অভিযোগের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিটার রিডার বলেন, তারা সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত নন, মাস্টাররোলে কাজ করেন। বিভিন্ন কোম্পানির মতো তাদের ওপরও বিলের টার্গেট দেওয়া হয়। ফলে অনেক সময় বাড়তি বিল করতে বাধ্য হন তারা। এ থেকে ঊর্ধ্বতন থেকে নিুপদস্থ কর্মচারীরাও ভাগ পান বলে দাবি করেন তিনি। ডেকোরেটর ব্যবসায়ী আবু সাইদ বলেন, তার বাসায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইউনিট অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে। মিটার রিডার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ অফিসে জানিয়েও কোনো সমাধান পাননি। জাহিদ নামে আরেক গ্রাহক বলেন, টাঙ্গাইলের প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রাহক ভূতুড়ে বিলের শিকার। কিন্তু কার কাছে অভিযোগ করলে দ্রুত সমাধান হবে, সেটিও অনেকে জানেন না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের টাঙ্গাইল কচুয়াডাঙ্গা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে তা দ্রুত সমাধান করা হয়।
টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার ছানোয়ার হোসেন জানান, পল্লী বিদুতের আওতায় জেলায় বিদ্যুৎ চাহিদা ২০০ মেগাওয়াটের স্থলে সরবরাহ পাচ্ছেন ১১৩ মেগাওয়াট। ঘাটতির কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ওবাইদুল ইসলাম জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সাময়িক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।






