
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইল জেলা ও উপজেলাগুলোতে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং এর কারণে মানুষের জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিং এর কারণে কলকারখানার উৎপাদনও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৭/৮ ঘন্টা বিদ্যুত পাচ্ছে না মানুষ। একবার বিদ্যুত চলে গেলে আসে ২/৩ ঘন্টা পর। আবার বিদ্যুত আসলেও থাকে এক/দুই ঘন্টা থেকে আবার চলে যায়। এতে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে মানুষ। সেই সাথে বয়স্ক ও শিশুরা নানাবিধ অসুস্থতার মধ্যে পড়ছে। তবে বিদ্যুত না থাকলেও অতিরিক্ত বিল গুণতে হচ্ছে এমন অভিযোগ গ্রাহকদের।
এদিকে বিদ্যুতের এই সংকটের মধ্যেই প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুত। সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার ব্যাটারী চালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জেই প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুত প্রায় দুটি উপজেলার দৈনিক চাহিদার কাছাকাছি। রাত আটটার পর বিদ্যুতের চাহিদা যখন সবচেয়ে বেশি, তখনই জেলার বিভিন্ন গ্যারেজগুলোতে সারি সারি অটোরিকশা চার্জে বসানো হয়। শত শত যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আর সেই চাপের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অধীনে টাঙ্গাইল সদরের তিনটি দপ্তর বৈল্লা, কচুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহ রোড, ভুঞাপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী ও সখীপুর। গ্রাহক সংখ্যা তিন লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৪ জন। এসব এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬০ থেকে ১৭০ মেঘাওয়াট। সরবরাহ করা হয় ১০০ থেকে ১১০ মেঘাওয়াট। ৬০ থেকে ৭০ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকে। যা চাহিদার শতকরা ৪১ ভাগ। এর মধ্যে টাঙ্গাইল পৌর শহর ও আশেপাশের এলাকায় ব্যাটারী চালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার রয়েছে প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশী। লোডশেডিং ও ঘাটতির মধেই টাঙ্গাইল পিডিবির আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৩৩ হাজারে বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক প্রতিদিন চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলার সদরের কিছু অংশ, কালিহাতী, বাসাইল, সখীপুরের কিছু অংশ, মির্জাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার ও সিরাজগঞ্জের চৌহালীর কিছু অংশ নিয়ে তাদের এলাকা বিস্তৃত। এই বিশাল অঞ্চলে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৬ লাখ ৫২ হাজার। এসব এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ২১০ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গিড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় গড়ে ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে প্রতিদিন ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও গ্যারেজ মালিকদের তথ্যমতে, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সাধারণত ১৫ অ্যাম্পিয়ারের চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারিতে চলে। এসব ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় এক থেকে দেড় ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ করতে প্রতিদিন আট থেকে ১২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগে। সে হিসেবে প্রতিদিন ৬০ হাজার ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে সাত লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। মেগাওয়াটের হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ৩০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, বিদ্যুতের তীব্র সংকটের মধ্যেও প্রতিদিন একটি উপজেলার চাহিদার কাছাকাছি বিদ্যুত চলে যাচ্ছে শুধু অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে।
এছাড়াও দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। বাসাবাড়িতে ফ্যান, লাইট ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও তখন বিদ্যুতের ব্যবহার থাকে বেশি। ঠিক সেই সময় থেকেই জেলার বিভিন্ন গ্যারেজে সারি সারি ইজিবাইক ও অটোরিকশা চার্জে বসানো হয়। অথচ চার্জিং লোড বাদ দিলে ৩০ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি কমতে পারত। পুরো ছোট ছোট দুটি উপজেলায় সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎ চাহিদা পুরণ করা যেত। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একসঙ্গে হাজার হাজার অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বেশিরভাগ অটোরিকশা গ্যারেজে চার্জ দেওয়া হলেও অনেক যান বাসাবাড়িতেও চার্জ দেওয়া হয়। ফলে দিন দিন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মারাত্বক প্রকট আকার ধারণ করছে।

টাঙ্গাইল পৌরসভার একটি স্কুলের শিক্ষক রুমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গরমে রাতে ঘুমাতে পারি না। যদি দেখা যায় এক ঘণ্টা কারেন্ট থাকে, তাহলে দুই ঘণ্টা থাকে না। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে খুবই কষ্টে আছি। দেলদুয়ারের পাহাড়পুর গ্রামের ছরোয়ার হোসেন বলেন, হিসাব ছাড়াই দিনরাত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণ মনে হয় অটো চার্জিং দেওয়ার কারণে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে গ্রামের গ্যারেজ গুলোতে শত শত অটো চার্জিং দেওয়া হয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে লোডশেডিং কমানো কঠিন হবে।
নাগরপুরের নয়াপাড়া গ্রামের অটোরিক্সা চালক আনোয়ার বলেন, সারাদিন যা আয় হয়, তার বড় অংশই চার্জিংয়ে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি চার্জ দিতে গ্যারেজে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দিতে হয়। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই এভাবে চার্জ দিচ্ছি। কারণ এই গাড়ি দিয়ে আমাদের কর্ম করে খেতে হয়।
টাঙ্গাইল এমএম আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামছুল হুদা বলেন, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা এখন শহর ও গ্রামীণ এলাকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম। একই সঙ্গে হাজারও মানুষের জীবিকারও উৎস। তবে নিয়ন্ত্রণহীন চার্জিং ব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব যানবাহনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা। অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি এবং বিদ্যুতের পিক আওয়ারে চার্জিং সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টাঙ্গাইল পিডিবির (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর তালুকদার বলেন, যেখানে আমরা গ্রাহকদের চাহিদামত বিদ্যুৎ দিতে পারছি না। সেখানে হাজার হাজার ইজিবাইক ও অটোচার্জ দিতে প্রচুর বিদ্যুত খরচ হচ্ছে। তবে আমরা তাদের বন্ধও করতে পারছি না। পৌর কর্তৃপক্ষ এবং বিআরটিএ সরব না হলে এগুলো বন্ধ হবে না। কারণ হাজার হাজার ইজিবাইক ও অটোরিক্সা তাদের অনুমতি না নিয়েই চলাচল করছে। তবে আমরা অবৈধ লাইন নিয়ে যারা চার্জিং এর গ্যারেজ বানিয়ে চার্জ দিচ্ছে সেখানে অভিযান পরিচালনা করছি।





