
স্টাফ রিপোর্টার, মির্জাপুর ॥
পৃথিবীর লৌহ দন্ড বলা হয় লাল মাটির পাহাড়কে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় যার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এর ওপর ভর করেই প্রকৃতি তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অথচ এক শ্রেণির ভূমিদস্যুরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে সেই পাহাড়গুলোকে সাবাড় করছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার আজগানা, তরফপুর, লতিফপুর ও বাঁশতৈল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় বেশকয়েকটি লাল মাটির পাহাড় রয়েছে। তবে সেসব পাহাড়গুলোতেও পড়েছে ভূমি খেকোদের থাবা। নিজস্ব ফায়দা লুটতে পাহাড়ের লাল মাটি কেটে বিক্রি, আবাসস্থল গড়ে তোলাসহ নানা স্বার্থে এসব টিলাগুলোকে নির্বিচারে বিলীন করে দিচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা ও জানা গেছে, নিঝুম রাতে চলে বনাঞ্চলের আবৃতে ঘেরা পাহাড় কাটার ধুম। বিগত কয়েক বছরে এ অঞ্চলের বেশকয়েকটি পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মাঝে চাপা ক্ষোভ থাকলেও প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতেও পারছেন না। প্রভাবশালী মহলটি ক্ষমতার দাপট ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতের আধাঁরে টিলার লাল মাটি কেটে সাবাড় করে ফেলছে। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ রাস্তা ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে।
মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর, তরফপুর ও ফতেপুর ইউনিয়নে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দিন-রাত সমানতালে ভেকু (এস্কেভেটর) মেশিন দিয়ে কাটা হচ্ছে পাহাড়ি টিলার লালমাটি ও নদী পাড়ের বালি মাটি। এসব মাটি বড় বড় ড্রাম ট্রাকে করে পরিবহন করায় গ্রামীণ পাকা রাস্তা নষ্ট হচ্ছে। মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইল অফিস ৫টি মামলা করেন। এসব মামলায় ব্যবসায়ী ছাড়াও জমির মালিকসহ ২০/২৫ জনকে আসামী করা হয়েছে। আইনকে পরোয়া না করে মামলার আসামী হয়েও থামেনি তাদের মাটি কাটার দৌরাত্ন্য। গত ১০ বছরে উপজেলার আজগানা, বাঁশতৈল, তরফপুর ও লতিফপুর ইউনিয়নে কমপক্ষে ২০টি টিলা কেটে সমতল ও গভীর করা হয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের কদমা রাধারচালা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই একর জমির টিলার লাল মাটি কেটে পুকুর তৈরি করা হচ্ছে। অন্যদিকে তরফপুর ইউনিয়নের তরফপুর পূর্বপাড়া রাখেরচালায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার একটি টিলা কাটা হচ্ছে। প্রায় ছয় একর জমির টিলাটি কেটে লাল মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া মাটি কাটার জন্য টিলার উপরে রোপনকৃত আম, কাঠাল ও দুই শতাধিক আকাশমনি গাছের চারা কেটে ফেলা হচ্ছে। এসব টিলার মাটি ভাড়ি ড্রাম ট্রাকে পরিবহন করায় প্রায় এক কিলোমিটার ইট সোলিং এবং প্রায় ছয় কিলোমিটার পাকা রাস্তা ভেঙ্গে কাঁচা রাস্তায় পরিণত হয়েছে। মাটি ভর্তি ড্রাম ট্রাক চলাচল করায় রাস্তার পাশের বাড়ি ঘর, সবজি ও ফসলি জমি ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে।
চলতি বছর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকায় সুজন শহিদুল, তরফপুর ইউনিয়নের তরফপুর পূর্বপাড়া এলাকায় রাখের চালায় ইলিয়াসের নামে রোকন, বাঁশতৈল ইউনিয়নে বাঁশতৈল এলাকায় শহিদুল দেওয়ান, অভিরাম এলাকায় সাহাদত হোসেন সাদাত, লতিফপুর ইউনিয়নের বান্দাচালা গ্রামে নোয়াব আলী লাল মাটি কেটে বিক্রি করার অভিযোগ আছে এদের বিরুদ্ধে। তাছাড়া উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বংশাই নদীর থলপাড়া ছাগলের ফার্ম ও বৈলানপুর এবং লতিফপুর ইউনিয়নের ফিরিঙ্গিপাড়া এলাকায় নদীর পাড় কেটে দিনে রাতে বালু মাটি লুট করা হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এভাবে টিলা ও নদীর পার ধ্বংস করা হলেও প্রশাসনের তেমন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বলে এলাকার লোকজন অভিযোগ করেছেন। প্রশাসনের নীরব ভূমিকার সুযোগ নিয়ে পাহাড় নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বেশি। ফলে পাহাড় ধসের ঘটনা বাড়ছে। অন্যদিকে পাহাড়ের শক্ত ভীত দুর্বল হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে গাছপালা, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে পাহাড় কাটা বন্ধ করার নির্দেশনাও আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, মাটি ব্যবসায়ীদের দল নেই। যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাটির ব্যবসা করছেন, তারাই আবার এখনও করছেন। গত বছর প্রশাসন যেভাবে অভিযান চালিয়েছিল, এবার তা চোখে পড়ছে না। তাদের দাবি, প্রশাসন দ্রুত অভিযান চালিয়ে এই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ না করলে পাহাড়ি এলাকার টিলা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। তরফপুর পূর্বপাড়া গ্রামের দিন মজুর মাসুুম, হযরত, শহীদ জানান, রাখেরচালা এলাকায় পাঁচগাও হুছেন মার্কেটের রোকন মাটি কাটছেন। এতে গ্রামের রাস্তা মারাত্নক ক্ষতি হচ্ছে। মাটি কাটা বন্ধ হচ্ছে না প্রতিদিন তা বাড়ছে।
রাখেরচালা টিলার গাছ কাটা শ্রমিক আজগানা ইউনিয়নের ঘাগরাই গ্রামের আছমত আলী, শুকুর খান, সামছু ও পাঁচগাও গ্রামের নোয়াব আলী বলেন, বাঁশতৈল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার লতিফ মিয়া গাছ কাটতে পাঠিয়েছেন। এ সময় মাটি কে কাটছেন জানতে চাইলে পাঁচগাও হুছেন মার্কেটের রোকনের নাম বলেন।
মাটি ব্যবসায়ী শহিদুল দেওয়ান জানান, তিনি বাঁশতৈল এলাকায় মাটি কাটছেন। এছাড়া অবিরাম এলাকায় সাহাদত হোসেন সাদাত, তরফপুর রাখের চালা এলাকায় রোকন চাচা ইলিয়াসের নামে মাটি কাটছেন বলে তিনি জানান। মাটি ব্যবসায়ী রোকন জানান, তিনি এ বছর মাটির ব্যবসা করছেন না। ৫০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করে ইলিয়াস নামে এক ব্যক্তির কাছে তার ভেকু মেশিন ও দুটি ড্রাম ট্রাক ভাড়া দিয়েছেন। এছাড়া তেলিনা এলাকায় সুজন শহিদুলের কাছেও তার ড্রাম ট্রাক ভাড়া দিয়েছেন বলে জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইলের পরিদর্শক বিপ্লব কুমার সূত্রধর বলেন, আমরা ২০২৪ সালে মির্জাপুরে অভিযান চালিয়ে ৫টি মামলা করেছেন। এসব মামলায় ব্যবসায়ী ছাড়াও জমির মালিকসহ ২০/২৫ জনকে আসামী করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাগুলোর স্বাক্ষী চলছে।
তরফপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজ রেজা বলেন, গ্রামীণ পাকা রাস্তা ও পরিবেশের মারাত্নক ক্ষতি হচ্ছে। জনগণ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না। টিলা কাটা ও গ্রামীণ রাস্তায় মাটি পরিবহন বন্ধ করা প্রয়োজন।
মির্জাপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) তারেক আজিজ জানান, ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালিয়ে ভেকু মেশিন ও কয়েকটি ডাম্প ট্রাক আটক করে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া ইয়াসমিন বলেন, অভিযান অব্যাহত আছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মাটি ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।






