
স্টাফ রিপোর্টার ॥
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় ধলেশ্বরী নদীর উপর নির্মিত এলাসিন শামছুল হক সেতুর টোলমুক্তের দাবি জানিয়েছে দেলদুয়ার ও নাগরপুর উপজেলাসহ চারটি উপজেলার জনগন। ইতিমধ্যে টোলমুক্তের দাবিতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ মানববন্ধন করেছেন তিন উপজেলাবাসীর শত শত লোকজন। এছাড়া জেলা প্রশাসকের কাছে স্বারকলিপিও জমা দিয়েছেন। সেতুটি টোল মুক্ত হলে টাঙ্গাইলের নাগরপুরসহ মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার কয়েক লাখ লোকের যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হবে। ফলে ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবার প্রসার ঘটবে। এছাড়াও এসব উপজেলার ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দ্বার উন্মোচিত হবে।
এদিকে তিন দিক নদী দ্বারা বেষ্ঠিত নাগরপুর উপজেলা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। উন্নয়নের দিক থেকে অন্যান্য উপজেলার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে নাগরপুর। একটি সেতুর অভাবে দির্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে ভুগছিল নাগরপুরবাসী। ফলে ধলেশ্বরী নদীর উপড় সেতু নির্মান ছিল নাগরপুরবাসীর কাছে একটি স্বপ্ন। সেখানে টোল আদায় কাংখিত ছিল না। টোল আদায় নিয়ে ইজাদারের সাথে মাঝে মধ্যেই গাড়ীর চালকদের সাথে ঝগড়া লেগেই থাকে। এছাড়া বেশি টোল আদায় করার অভিযোগ রয়েছে ইজারাদারের বিরুদ্ধে।
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন এই নদীর উপর নৌকা দিয়ে পারপার হতো চার উপজেলা দেলুদয়ার, নাগরপুর, চৌহালী ও দৌলতপুর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। কষ্টের কোন শেষ ছিল না। পরবর্তীতে বিগত ১৯৯২ সালে নদীর উপর ফেরি দিয়ে পারাপার শুরু হয়। বিগত ২০০৯ সালের (১৬ মার্চ) সেতু নির্মানের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়। শুরু হয় বহু প্রতিক্ষিত সেতুর কার্যক্রম। প্রায় ৫১৫.১২ মিটার লম্বা ও ১০.২৫ মিটার প্রশস্থ ও সেতুর নির্মানের ব্যয় ধরা হয় ৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৭ টাকা। দরপত্র মুল্যায়ন বোর্ড সর্বনিম্ম দরদাতা হিসাবে আব্দুল মোনেম লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে একই বছরের ৩০ মাসের মধ্যে সেতুর নির্মান কাজ শেষ করার জন্য সময়সীমা বেধে দিয়ে (১২ অক্টোবর) কার্যাদেশ দেয়। এদিকে নদী শাসন ও গাইড বাধ নির্মানের জন্য ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে পারিসা ট্রেড সিস্টেম লিমিটেড নামের অপর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। সেতুর নাগরপুর উপজেলা প্রান্তে ২ কিলোমিটার এবং দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন প্রান্তে ৪শ মিটার গাইড বাধ নির্মান করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সেতুর নির্মান কাজ শেষ হলে বিগত ২০১৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে স্বশরীরে এসে সেতুর উদ্বোধন করেন ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকে নামে নামকরণ করার ঘোষনা দেন। এরপর শুরু হয় যানবাহন চলাচল। কার্যক্রম শুরু হয় টোলের।
জানা যায়, ১০ চাকার গাড়ি ৩শ’ টাকা, হেভী ট্রাক ১৮০ টাকা, মিডিয়াম ট্রাক ১৫০ টাকা, বড় বাস ১৩৫ টাকা, মিনি ট্রাক ১১৫ টাকা, কৃষি কাজে ব্যবহৃত যান ৯০ টাকা, মিনি বাস ৭৫ টাকা, মাইক্রোবাস ৬০ টাকা, ফোর হুইল চালিত যানবাহন ৬০ টাকা, সিডান কার ৪০ টাকা, সিএনজি / অটো ১৫ টাকা, মোটরসাইকেল ১০ টাকা ও রিক্সা, ভ্যান বাইসাইকেল ৫ টাকা করে টোল নির্ধারিত করা হয়।

সেতুটি চালু হওয়ার পর থেকে চারটি উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে এই সেতু দিয়ে। সেতুটির টোল মুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আওয়াল লাভলু টোল মুক্ত করতে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেন। বর্তমানে এস এম জাহাঙ্গীর নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা দিয়ে টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগ থেকে ইজারা নিয়ে দুই বছর পাঁচ মাসের জন্য টোল আদায় করে চলছে। চলতি বছরের জুন মাসে তাদের মেয়াদ শেষ হবে। ইতিমধ্যে দরপত্র আহবান করা হয়েছে। কাংখিত দরমুল্যে না পাওয়ায় সপ্তম বারের মত দরপত্র আহবান করা হয়েছে।
এদিকে স্থায়ীভাবে টোল বন্ধ, সেতুর সংস্কার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ১০ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে নাগরপুরের শত শত জনগন। এর আগে বিগত ২০২৪ সালের (৮ আগস্ট) বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা টোল ঘর ভাংচুর করে সেতুর টোল আদায় বন্ধ করে দেয়। উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হলে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, থানা পুলিশ এবং সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছাত্র-জনতার সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সম্প্রতি টোল বন্ধের দাবিতে নাগরপুর সরকারি কলেজ গেট এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শ্রমিক সংগঠন এবং শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এতে বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপি সহ-সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম ফরিদুজ্জামান কোহিনুর, নাগরপুর সরকারি কলেজের সাবেক জিএস নুরুজ্জামান রানা, উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক মীর খালিদ মাহবুব রাসেল, সদস্য সচিব শহীদুর রহমান মনির প্রমুখ।
সিএনজি চালক শাহাদত দেওয়ার বলেন, সেতু বানাইতে যে খরচ হইছে সেই টাকা উঠে গেছে। এখন সরকারের উচিত এই সেতু থেকে টাকা না নেওয়া। ট্রাক চালক রফিকুল ইসরাম বলেন, এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে প্রায় চারশ টাকা লাগে। যে ভাড়া পাই ওই টাকা দিয়ে পোষায় না। এ কারণে আমরা টোল মুক্তের দাবি জানিয়ে আসছি। নাগরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল ইসলাম রেজা বলেন, নাগরপুর উপজেলাসহ তিনটি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের প্রাণের দাবি এই সেতুর টোলমুক্ত হোক।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমিরী খান জানান, সেতু থেকে টোল আদায় সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস। বিগত ২০১৪ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০০ মিটারের অধিক দৈর্ঘ সেতুতে টোল আদায় করা হয়। সেই অনুযায়ী ৫১৫.১২ মিটার লম্বা এই সেতু থেকে টোল আদায় হচ্ছে। দির্ঘদিন ধরে টোল মুক্তের দাবি জানিয়ে আসছে এলাকার লোকজন। সেহেতু রাজনৈতিক, সামাজিক, শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিণ্ন শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিদের দাবির মুখে আলোচনা করে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, টোল মুক্তের দাবিতে দেলদুয়ার ও নাগরপুর উপজেলার জনগণ দাবি জানিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে আমি জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে টোল বন্ধের আহবান জানিয়েছি। সড়ক ও জনপথ মন্ত্রনালয়ে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে শামছুল হক সেতুর টোল আদায় বন্ধ করা যায়। টোল আদায় বন্ধ হলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ কোন প্রকার ভোগান্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে।





